এখন যেভাবে নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির সংখ্যা বাড়ছে, টেনশনে আছি বাচ্চারা সোশ্যাল হিসেবে কিভাবে বড় হবে।
একটা যৌথ পরিবার ছোট শিশুর সুস্থ বিকাশের জন্য কতটা জরুরি তা গত এক বছর একদম চোখের সামনে দেখছি৷ বাবু হওয়ার পর সবাই একসাথে থাকার সুযোগ হয়েছিল। নানা নানি খালা সবার সাথেই বাবুর আলাদা সম্পর্ক। এই জিনিসটা বুঝতামই না যদি একা থাকা হতো।
এখন অধিকাংশ পরিবারেই বাচ্চারা নিউক্লিয়ার ফ্যামিলিতে বড় হচ্ছে। খারাপ লাগে যখন দেখি বাবা মা দুইজনই জব হোল্ডার, বাসার ছোট বাবুটা কাজের লোকের কাছে বড় হচ্ছে।
সেদিন ছাদে যাওয়ার পর দেখি পাশের বিল্ডিংয়ের বারান্দা থেকে একটা বাবু আমাদের ডাকছে। কাছে যাওয়ার পর নিজে থেকেই কত কথা! বলছে বাবা অফিস থেকে আসবে সেই রাতে, মাও ডাক্তার, বাসায় দাদু রান্না করছে। ওর সাথে খেলে না। বের হতে চায় কিন্তু পারছে না। বারান্দায় একলা একলা কথা বলে খেলছে। আমাদেরকে পেয়ে তাই ছাড়তেই চাচ্ছিলো না। দেখে যে কি মায়া হচ্ছিল!
আমাদের সময়ে আমরা প্রতিবেশী বাবুদের সাথে খেলেই বড় হয়েছি। সারা বিল্ডিংয়ের সব বাচ্চা একসাথে ছাদে গিয়ে খেলতাম। আম্মুরা ধরে বেঁধে বাসায় ঢুকাতো। এখন ঢাকায় ছাদ থাকে তালা দেয়া। পাশের বাসায় কে থাকে সেটাও জানিনা। সেইফটি ইস্যুর কারণে বাচ্চাদের কারোর বাসায় যেতে দেয়া হয় না। যার ফলে স্মার্টফোন, পিসি এধরণের স্ক্রিন টাইমে আসক্তি বেড়ে যাচ্ছে।
শুক্র শনি ছাড়া বাবা মা বাচ্চাদের নিয়ে বেরও হতে পারে না। আমাদের সময় থাকলেও ঢাকা শহরে বাবুকে নিয়ে ঘুরার মতন জায়গা খুঁজে পাইনা। ভাবি, এই টিভি, আর ফোন দেখে বড় হওয়া বাচ্চাদের কত ধরণের সমস্যা দেখা যাচ্ছে।
বিকল্প উপায় হিসেবে কি ধরণের সমাধান আছে? বিদেশে যেমন ডে কেয়ার ভরসা। আর সেখানে সুন্দর ভাবে কোয়ালিটিও মেইনটেইন করা হয়। পড়াশোনা, প্রতিদিনকার কাজ, ম্যানার, সোশ্যালাইজেশন সবই শেখানো হয়।
আমাদের দেশেও ডে কেয়ার তৈরি হচ্ছে কিন্তু সার্ভিস চার্জ ভয়াবহ। সপ্তাহে ৬ দিন ৮ ঘন্টার জন্য প্রায় ২০ হাজার টাকা গুনতে হয়। আর বাসায় কাজের লোকের কাছে তো রেখে যাওয়া এখন খুব রিস্কি হয়ে গেছে। অফিসে ডে কেয়ার না থাকলে হয়তো চাকরিই অনেককে ছাড়তে হয়।
এখন অফিস বা বাসার দেখভাল, যেটাই করা হোক না কেনো, কিছু সময়ের জন্য হলেও বাচ্চাদের খোলা আকাশের নিচে হাঁটতে নিয়ে যান।
তবে কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় বাইরে নিয়ে গেলেও কিছুক্ষণ পর আবার বের হওয়ার জন্য জিদ করে।
সেদিন একটা ওয়েবসাইট থেকে জানতে পারলাম শিশুদের বার বার বাইরে যেতে চাওয়ার একটা কারণ হলো Dopamine Craving. খোলা আকাশ বা প্রকৃতি শিশুদের মস্তিষ্কে Dopamine (Happy Hormone) রিলিজ করে। বাচ্চা যখন বাসায় চার দেয়ালের ভেতর থাকে, তার ব্রেইন ওই "Feel Good" কেমিকেলটা পায় না। ফলে জিদ বেড়ে যায়৷
আর ৬ বছরের কম বয়সী বাচ্চাদের যুক্তি বুঝার ক্ষমতা কম। তাদের মস্তিষ্কের Prefrontal Cortex (যেটা যুক্তি ও সময় বোঝে) তৈরি হয় না। তাই "আগামীকাল যাব" এধরণের সান্ত্বনা মূলক কথার কোনো অর্থ নেই।
এক্ষেত্রে সলুশন হিসেবে counseling এ যা করতে বলা হয় তা হলো Closing Ritual তৈরি করা। জাপানিজ প্যারেন্টিং স্টাইলে আশপাশের সব কিছুকে বিদায় দেয়া। যেমন বাসায় আসার ৫ মিনিট আগে থেকেই বলা "বাবা, আমাদের এখন বাসায় যাওয়ার সময় হয়েছে। তুমি আর ৫ মিনিট খেলতে পারো।" , "গাছকে টা-টা দাও, দোলনাকে বাই-বাই বলো। আমরা আবার কাল আসবো।" এই জিনিসটা বাচ্চার ব্রেইনকে সিগন্যাল দেয় যে অ্যাক্টিভিটি শেষ হচ্ছে, কিন্তু আবার হবে।
আবার ভিজুয়াল রুটিন ও তৈরি করা যায়। কারণ বাচ্চারা শুনে বোঝে না, দেখে বোঝে। তাই এমন চার্ট বানানো যায় যেখানে ছবি দিয়ে দেখানো হবে: সকাল = নাশতা | বিকেল = খেলা | রাত = ঘুম।
বাচ্চা যখন জেদ করবে, তাকে কোলে নিয়ে ছবির সামনে যান। বলুন, "দেখো তো এখন কী সময়? এখন চাঁদ মামার সময়, আমাদের ঘুমাতে হবে, এখন আর পার্ক খোলা নেই।" এভাবে বাচ্চার অযৌক্তিক জেদ কমানো যেতে পারে।
কিন্তু তাই বলে বাচ্চাকে বাইরে নেওয়া বন্ধ করা যাবে না। সপ্তাহে অন্তত ২/৩ দিন বাইরে নেয়ার চেষ্টা করুন। না হলে বাবুর ভেতরর "Pent-up Energy" জমতে থাকবে, যা বাসায় ভাঙচুর, চিৎকার বা মারামারির রূপ নেবে। তার চেয়ে নিয়ম মেনে, নির্দিষ্ট সময়ে বাইরে নিন।
সবকিছু মিলিয়ে বাস্তবতা এখন এমন হচ্ছে যে পরিবারের জন্য আমরা আলাদা সময় বের করতে পারিনা। কিন্তু শিশুর প্রথম তিন বছর সুস্থ মানসিক বিকাশের জন্য মা এর বিকল্প হয় না। তাই যতটাই পারা যায় আপনার শিশুকে সময় দিন। আশপাশের পরিবারদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলুন। বাচ্চাদের ঘাস, পানি, মাটি, কাদার মধ্যে ছেড়ে দিন। বাসার বানানো খাবার খাওয়ান। পড়াশোনায় ভালো করার চেয়ে এসব বেশি জরুরি!!